শেখ হাসিনার পলায়ন

- সাধারণ জ্ঞান - বাংলাদেশ বিষয়াবলী | NCTB BOOK
47

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিকেল প্রায় ২:২৫ মিনিটে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং তার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে সি-১৩০জে হেলিকপ্টারে করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি আগরতলা হয়ে দিল্লিতে পৌঁছান। পলায়নের আগে তিনি একটি বক্তৃতা রেকর্ড করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তবে তিনি সেই সুযোগ পাননি।

ছাত্র–জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট  ভারতে পালিয়ে যান

ঘটনা প্রবাহঃ

‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে ৫ আগস্ট (৩৬ জুলাই) সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেদিন ছিল সোমবার, ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপের’ এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন। বিপুল জনস্রোতের লক্ষ্য ছিল গণভবন।

সেদিন সকালেও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। সেদিন ঢাকার সব প্রধান সড়কেই নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকা, শাহবাগসহ বিভিন্ন দিক থেকে আসছিলেন ছাত্র–জনতা। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও কিছু স্থানে অবস্থান নিতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাত্র–জনতার মিছিলের বাধা সরিয়ে নেন। দুপুরের আগেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে সরকার নড়বড়ে হয়ে গেছে।

ছাত্র–জনতার সবার গন্তব্য ছিল গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন। একপর্যায়ে তাঁরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনের মধ্যে ঢুকে পড়েন।

গণভবনের মাঠে হাত উঁচু করে উল্লাস করেন অনেকে। কেউ কেউ গণভবন ও সংসদে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস নিয়ে বেরিয়ে যান। সংসদ ভবনে প্রবেশ করেও উল্লাস ও আনন্দ মিছিল করেন ছাত্র–জনতা। অনেকের হাতে ছিল লাল–সবুজের জাতীয় পতাকা। বিকেল থেকে ছাত্র–জনতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন। অনেকেই কার্যালয়ের ছাদে উঠে যান।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনে মানুষের আনন্দ–উল্লাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে সংসদ ভবন এলাকায়

ছাত্র–জনতার অনেকে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন গণভবন-প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদের দেয়াল এবং বিভিন্ন স্থাপনায় লিখে, ছবি এঁকে। দেয়ালে বিভিন্ন প্রতিবাদী লিখনে উঠে আসে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শাসনামলের নানা অনিয়ম ও দুঃশাসনের কথা।

জনস্রোত গণভবনে পৌঁছানোর আগেই ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বেলা আড়াইটায় একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা, যিনি কয়েক দিন আগেই (১ আগস্ট) বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা কখনো পালায় না।’

এর মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সফল পরিণতি ঘটে। সব মিলিয়ে ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট, ছাত্র–জনতা শেখ হাসিনার মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি পেলেন চরম কর্তৃত্ববাদী এক শাসন থেকে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন সকালেও গুলি চলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়, যাতে ছাত্র-জনতার অনেকে হতাহত হন। পালিয়ে যাওয়ার পরও এমন গুলির ঘটনা ঘটে। এ দিন সারা দেশে শতাধিক মানুষ নিহত হন। তার আগের দিনও নিহত হন শতাধিক।

সরকার পতনের পর মানুষের দীর্ঘদিনের পূঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে সারা দেশে। প্রধান বিচারপতির বাসভবন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসভবন সুধা সদনসহ রাজধানীতে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, দলীয় সংসদ সদস্য ও নেতাদের বাসভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা ও আগুন দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও।

সেনাপ্রধানের ভাষণ ও সমন্বয়করা সংবাদ সম্মেলনে

শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদর দপ্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল (বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) ছাড়াও বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাস, জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমান, এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম, জাতীয় পার্টির জি এম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, খেলাফত মজলিসের মাওলানা মামুনুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের পর সেনাপ্রধান জনগণের উদ্দেশে বলেন, “সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা এখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা একটি সুন্দর আলোচনা করেছি এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের সকল কার্যক্রম এখন এই সরকার দ্বারা পরিচালিত হবে।” তিনি সব হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচার করা হবে এবং সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীতে আস্থা রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সবাইকে সহিংসতার পথ ছেড়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান এবং ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি শীঘ্রই ছাত্র-শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকও করবেন বলে জানান।

সেদিন বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ধৈর্য ও সহনশীল আচরণের আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হবে এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন মামলায় আটক সকল বন্দীকেও মুক্তি দেওয়া হবে।

বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, জেএসডি ও অন্যান্য পক্ষের প্রতিনিধিরা ছিলেন।

অন্যদিকে, ৫ আগস্ট রাতে তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করেন। সঙ্গে ছিলেন সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদার। সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-নাগরিকদের সমর্থিত সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকার গ্রহণযোগ্য নয়। তারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দেবেন, যেখানে ছাত্র-নাগরিক, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসিফ মাহমুদ “জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু” শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। বইতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ৫ আগস্ট রাতে টোয়েন্টিফোর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আগে ছাত্র-নাগরিকরা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে অধ্যাপক ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিতে সম্মত হন। রাত তিনটায় ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় অধ্যাপক ইউনূসের সম্মতির তথ্য ঘোষণা করা হয়।

সোর্সঃ প্রথম আলো

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...